নিউইয়র্কে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি সমাবেশে লেখক-কলামিস্ট মিনা ফারাহ্্’র বক্তব্যে উত্তেজিত হয়ে উঠেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা। এক পর্যায়ে প্রতিবাদের মুখে মিনা ফারাহ মাইক ছেড়ে মঞ্চ ত্যাগ করে দর্শক সাড়িতে বসেও টিকতে পরেননি। অবশেষে নিরবে তিনি সমাবেশ স্থল ত্যাগ করেছেন।

৩ আগস্ট অপরাহ্নে জ্যাকসন হাইটসে ডাইভার্র্সিটি প্লাজায় ‘প্যাট্রিয়ট বাংলাদেশ’ নামক নবগঠিত একটি সংগঠনের সমাবেশে এমন তুলকালাম কান্ড শুরু হয় মিনা ফারাহ’র ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার কথিত প্রেক্ষাপট উপস্থাপনকালে। মিনা ফারাহ বলছিলেন, ‘আমি বলতে চাই যে একাত্তর সাল থেকে চব্বিশ সাল পর্যন্ত ৫৪ বছরে যতগুলো ভুল বিপ্লব করছি আমরা একের পর একটা, পঁচাত্তরে ভুল বিপ্লব হইছে, শেষ করি নাই ফ্যাসিবাদ, মাইনাস ওয়ান করি নাই। আমরা একটি পরিবারকে সুযোগ পেয়েও শেষ করি নাই। সেই পরিবারটা মুজিব পরিবার। যেহেতু আমরা পুরো পরিবারকে শেষ করার পরই মাইনাস ওয়ান করতে পারি নাই। এরফলে মাইনা ওয়ান, শেষে গিয়ে হলো মাইনাস টু। ২০০৮ সালে আমরা আবার সুযোগ পেলাম, দুটি পরিবার দুটি ফ্যাসিস্ট-সন্ত্রাসী, দুটি একনায়ক, দুটি ফ্যাসিস্ট পরিবার-এদেরকে ফিনিশ করে দেশটিকে গণতান্ত্রিক পথে ফিরিয়ে অনতে। আমরা সেটিও মিস করলাম। আমরা ওটা মিস কইরে আবার দুটো ফ্যাসিবাদকে রেখে দিলাম। একটা হচ্ছে বিএনপি আরেকটা আওয়াম লীগ। হয়তো (আমার এ বক্তব্য) অনেকের পছন্দ হবে না, কিন্তু আমি স্টেট ফরোয়ার্ড কথা বলি, আই ডোন্ট কেয়ার, আই ডোন্ট বিলং অ্যানি পার্র্টি। আওয়াম লীগ বিএনটি-দুটাই ফ্যাসিবাদ।’ মিনা ফারাহ আরো বলেন, ‘আওয়ামী লীগ-বিএনপি দুটোই ফ্যাসিস্ট দল। তারা আমার দেশকে লুটেছে, ব্যাংকগুলো খালি করে, পাচার করে আমাদেরকে বানিয়েছে একটি ভিক্ষুকের রাষ্ট্র। উই ডাজ নট লাইক। নাউ, এখোন আমাদের চব্বিশ সালটাও ভুল বিপ্লব হয়েছে। সো আই অ্যাম সেইং’———–আর বলতে পারেননি। সমাবেশের বিশেষ সম্মানীত অতিথি যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির অন্যতম যুগ্ম সম্পাদক আকতার হোসেন বাদলসহ অনেকে আপত্তি করতে থাকেন। ‘ধর ধর’ বলে অনেকে মঞ্চের দিকে তেড়ে গেলে, এবং আপত্তির মুখে মাইক ছেড়ে মঞ্চ ত্যাগ করেন মিনা ফারাহ। মিনা ফারাহ দর্শক সাড়িতে বসেন। কিন্তু বিএনপির নেতা-কর্মীসহ দর্শক সাড়ির অনেকে চিৎকার শুরু করলে মিনা ফারাহ বিনা বাক্যব্যয়ে সমাবেশ স্থল ত্যাগ করেন। এ সময় উপস্থাপক দেলওয়ার হোসেন শিপন বলেন, উনি ওনার বক্তব্য দিয়েছেন, আমরা সেজন্যে দু:খিত। আমি একটা কথা বলতে চাই যে, ওনার বক্তব্য আমরা প্রত্যাহার করে নিলাম। এরপর ‘প্যাট্রিয়ট বাংলাদেশ’র অন্যতম সংগঠক মশিউর রহমান লিটন বলেন, আমরা কেউই মায়ের পেট থেকে শিখে আসিনি। নানাভাবে শিখছি। তাই ধৈর্য ধরুন, জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে বক্তব্য দিন। আয়োজকদের অন্যতম ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল কাদের মাইক হাতে নিয়ে বলেন, ‘উনি বয়স্ক মানুষ। হয়তো অসুস্থ, রোগী। বলতেই পারেন। ঠিক আছে, আমি এজন্যে ক্ষমা চাচ্ছি। এভাবে বলতে পারেন না। এটা ঠিক হয়নি। আমরাও শহীদ জিয়াকে রেসপেক্ট করি। ওনার আদর্শকে আমরাও মানি। লেটস ওয়ার্কস টুগেদার।’ এরপর পরিস্থিতি মোটামুটি শান্ত হয় এবং আলোচনা পর্ব অব্যাহত রাখার মধ্যেই সমাবেশ স্থলের বাইরে যুক্তরাষ্ট্র ছাত্রলীগের কিছু নেতা-কর্মীসহ আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান শুরু করেন। একদিকে জুলাই-আগস্ট বিপ্লব আলোকে বক্তব্য, আরেকদিকে জয় বাংলা স্লোগানে সবকিছু এলোমেলো হয়ে পড়ে। সমাবেশের লোকজন হতভম্ব, মঞ্চ থেকে দৃষ্টি নিপতিত হয় ছাত্রলীগের স্লোগানের প্রতি। বেশকিছুক্ষণ এভাবে চলার পর পুলিশ এসে জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগানদাতাদেরকে ধাওয়া করে পার্শ্ববর্তি ইত্যাদি সুপার মার্কেটের অপর প্রান্তে নিয়ে যান। সেখানে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা পুলিশকে চ্যালেঞ্জ করলে বিএনপি নেতা আকতার হোসেন বাদল পরিস্থতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। পুলিশ জানতে চান যে, কেউ আহত হয়েছে কিনা। না সূচক জবাব পাওয়ায় গ্রেফতারের উদ্যোগ থেমে যায়। নিউইয়র্ক পুলিশের সদস্যরা ছাত্রলীগের সমর্থকদের সরে যেতে অনুরোধ করেন। এরপর সমাবেশ চলতে থাকে।
উল্লেখ্য, জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের স্মরণে এ সমাবেশ শুরু হয় ঐ অভ্যুত্থানের ওপর স্থির চিত্রের প্রদর্শনী উদ্বোধনের মধ্যদিয়ে। ‘প্যাট্রিয়ট বাংলাদেশ’র আহবাক যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নেতা এম এ সবুর, বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী ইমামসহ বেশ কজনকে পাশে নিয়ে ফিতা কেটে চিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন সমাবেশের বিশেষ সম্মানীত অতিথ বিএনপি নেতা ও মূলধারার ব্যবসায়ী সংগঠনের পরিচালক আকতার হোসেন বাদল। এ সময় বাদল বলেন, গত ১৫/১৬ বছর স্বৈরাচারি শেখ হাসিনা ও তার পেটুয়া বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিএনপির নেতা-কর্মীরা লাগাতার আেেন্দালনে ছিলাম। লন্ডন থেকে আমাদের নেতা তারেক রহমানের দিক-নির্দেশনায় জুলাই-আগস্টের বিপ্লব পরিপূর্ণতা পায় শেখ হাসিনার পতনের মধ্যদিয়ে। কিন্তু বছর পেরিয়ে যাচ্ছে, সেই বিপ্লবের প্রত্যাশা এখনো পূর্ণতা পায়নি। জুলাই-আগস্ট বিপ্লবে শহীদদের আত্মা শান্তি পাবে অবিলম্বে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে জনগণের সরকার ক্ষমতায় বসলে। প্রবাসীরাও সে প্রত্যাশায় রয়েছি।
সমাবেশে আলোচনাকালে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম সদস্য আব্দুল লতিফ সম্রাট বলেন, ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে উৎখাতের লড়াই-সংগ্রামের সফল সমাপ্তি ঘটবে মানুষের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার মধ্যদিয়ে। সেই জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের বর্ষপূর্তিতে সেই আহবানই জানাচ্ছি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মুহম্মদ ইউনূসের সমীপে। সম্রাট উল্লেখ করেন, ফ্যাসিস্ট হাসিনা-সহ তার দোসরদের বিচার শেষ হলেই বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনে সক্ষম হবে।

সমাবেশে বিশেষ সম্মানীত অতিথি হিসেবে আরো বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক ড. শওকত আলী। তিনিও জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি প্রবাসীদের সমর্থন অব্যাহত রাখার সংকল্প ব্যক্ত করেন।

শুভেচ্ছা বক্তব্যে বিএনপি নেতা মোশারফ হোসেন সবুজ, এ এফ এম মিসবাহউজ্জামান, নার্গিস আহমেদ, মাহতাব খান, সাঈদ আজাদ, মাহতাব উদ্দিন, আহসান হাবিব, ওসমান গনি, জয়নাল আবেদীন, মিস প্রিসিলা আয়োজকদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন বাংলাদেশকে স্বৈরাচার মুক্ত করার আন্দোলন-লড়াইয়ের স্মৃতিচারণী সমাবেশ করার জন্যে। আলোচনার ফাঁকে ‘উনবাঙাল’ নামক একটি সাহিত্য সংগঠনের সদস্যরা কাজী জহিরের সমন্বয়ে আবৃত্তি ও গানে গানে ভাসিয়ে নেন পুরো সমাবেশকে।
হোস্ট সংগঠনের আহবায়ক এম এ সবুর সকলের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন পুরো আয়োজনকে সাফল্যমন্ডিত করতে সর্বাত্মক সহযোগিতার জন্যে। সবুর বলেন, বাংলাদেশকে ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার দোসরকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এই প্রবাসেও দেশপ্রেমিক সকলকে সজাগ থাকতে হবে এবং চিহ্নিত করতে হবে ওদেরকে।
সমাবেশ স্থলে হাজির হয়ে শুভেচ্ছা বক্তব্যের পর নিউইয়র্ক স্টেট সিনেটর জন ল্যু জুলাই-আগস্ট বিপ্লবে অবদান রাখা কয়েকজন প্রবাসীর মধ্যে ‘বিশেষ সম্মাননা’ সার্টিফিকেট বিতরণ করেন। গণমাধ্যম কর্মীরাও পেয়েছেন সেই সার্টিফিকেট।